বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন ১৯৮২ সালে । স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে হত্যার শিকার হলে দেশে, বিশেষ করে বিএনপিতে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয় সে অবস্থায় বেগম জিয়ার রাজনীতিতে আসার কোন বিকল্প ছিল না। তিনি বিএনপির হয়ে দেশের হাল ধরেছিলেন। একজন গৃহবধূকে ঘর থেকে বের হতে হয়েছিল। তাঁকে নানা আন্দোলন সংগ্ৰামে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর ৯১’ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী রুপে আত্ম প্রকাশ করে ইতিহাস রচনা করেন। মহৎ প্রাণ এ মানুষটিকে জীবনে অনেক বার দেখেছি। তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম নরসিংদীর শিবপুরে শহীদ আসাদ কলেজ মাঠে একটি জনসভায়। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় তাঁকে আবারও দেখি শিবপুরে আজকের সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নির্বাচনী সভায়। সেদিন তাঁর উচ্ছসিত বক্তৃতার কথা এখনো মনে পড়ে। ওই দিন বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে তিনি আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে পরিচয় করে দিয়ে উপস্থিত জনগণকে বলেছিলে,’ আপনারা ভোট দিয়ে মান্নান ভূঁইয়াকে জয়যুক্ত করবেন, আমরা তাকে উপযুক্ত মূল্যায়ন দিবো ইন্সাল্লাহ। ওই দিনের কথার যথার্থতা পেয়েছিলাম তাঁর ক্যাবিনেটে মান্নান ভূইয়াকে শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রী হিসেবে দেখে। পরবর্তীতে এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া বিএনপির মহাসচিব হয়ে সুদীর্ঘ ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি করেছি অবস্থায় মুন্সীগঞ্জের কয়েকটি জন সভায় আমাকে থাকতে হয়েছে। সর্বশেষ শ্রীনগর উপজেলার কেয়টখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে একেবারে কাছে থেকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দেখেছি। ওইদিন শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের তিনি ব্লাকবোর্ডে বর্ণ লিখে লিখে শিখিয়েছিলেন। অফিসিয়াল নির্দেশে ছাত্র-শিক্ষকের কাছে কাছে থাকতে হয়েছিল বিধায় তাঁর হাসিমাখা মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। অনেক প্রটোকলের ভিতর দিয়ে তিনি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলে আমরা তাঁকে স্বাগত জানাই। সালাম দিলে তিনি হাসি দিয়ে ভালো আছি কিনা এ জাতীয় কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে মূহুর্তটি আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে আছে।
নিজের দায়িত্ব কর্তব্য সঠিক ও সুন্দর ভাবে প্রতিপালন করতেন জনস্বার্থে। এ ছাড়াও তিনি পর মতের প্রতি যতেষ্ঠ সহিঞ্চু ছিলেনন। ছিলেন শান্তিপ্রিয় মানুষ। কোন প্রকার পরশ্রীকাতরতা কিংবা প্রতিহিংসা বা বিদ্ধেষ তাঁর মধ্যে ছিলনন না। রাজনৈতিক জীবনে বার বার উদারতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। ১৯৯৬ সালে দেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন, এমন আরোও অনেক কাজ। সবচেয়ে বড় গুন ছিল যে,সময়ের প্রয়োজনে তিনি শান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করতে পারতেন। বিরোধী পক্ষের কথা শুনতে এবং যুক্তিসঙ্গত দাবী মেনে নিতে চেষ্টা করতেন। নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই ভালো মানুষেরা সব সময় পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ফ্যাসাদ এড়িয়ে চলতে পারেন। তাদের অনেকে সব সময় সবার জন্য সমসাময়িক হয়ে থাকেন। সময়ের প্রয়োজনে অনেকের মধ্যেই মত ভেদ দেখা দেয়, দ্বন্দ্ব, বিবাদ বিসম্বাদ হয়ে থাকে, কিন্তু তাদের কারো দ্বারা সাধারণ মানুষের অনিষ্ঠ হয়না। মহান সৃষ্টিকর্তা বেগম খালেদা জিয়াকে ওই সমস্ত গুনে গুনান্ধিত করেছিলেন। অবশ্যই অন্যায়ের নিকট তিনি কখনো আপোষ করতেন না। তাই তিনি আপোষহীন নেত্রীর খ্যাতি পেয়েছিলেন।তিনি জনগণের হৃদয় সিংহাসনে একটি স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। অন্য কেউ তাকে এগোলো অর্জন করে দেননি, তিনি নিজেই তা তৈরি করে নিয়েছেন। পৃথিবীতে শাসনকার্য পরিচালনায় কার কত বড় ড্রিগ্ৰী আছে সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। কৃতিত্বের দিক হল জনগণ তাকে কতটুকু গ্ৰহণ করেছে, জনকল্যাণে, আচার আচরণে ও আন্তরিকতায় তিনি কতটা জনপ্রিয়।
রাজনীতির কঠিন আবর্তে অনেকেই ঘুরপাক খেয়ে থাকে। অনেকে বলেন, রাজনীতি অনেক দূরহ কাজ। রাজনীতিতে নাকি নিজের ছায়াকে ও বিশ্বাস করা যায়না। কবি জয় গোস্বামী বলেছেন, “সবকিছু বুঝলেও আমি রাজনীতি বুঝিনা। আমরা সকলে সমানভাবে রাজনীতি না বুঝলে ও একজন রাজনীতিবিদের ভালো মন্দ দিকগোলা কিছু কিছূ বুঝতে পারি । এতটুকু বুঝি যে,শ্রদ্ধেয় প্রয়াত খালেদা জিয়াকে কেউ কোন দিন স্বৈরাচারী, স্বৈরণী, টাইরানী, এক নায়ক,স্বেচ্ছাচারী অথবা কর্তৃত্ববাদী বলতে পারবেন না। তিনি ছিলেন জন নন্দিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে মহিলা প্রধানমন্ত্রী আরোও হয়েছেন এবং হবেন। কিন্তু খালেজা বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যা আমাদের একটি বড় রেকর্ড। তিনি যতবার্ দেশের যে কোন আসন থেকে নির্বাচন করেছেন একটি ও মিস যায়নি, সকল আসনে জয়ী হয়েছন। এক একটা নির্বাচনে ৫টি আসনে বিজয়ী হওয়ার অনন্য কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। শুধুমাত্র জনগণের ভালোবাসাই তাঁকে এভাবে বিজয়ী করে এনেছে। তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।
বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। একজন মানুষ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রধান হওয়ার পর তাঁর আর কিছুই চাহিদা থাকতে পারে না কথাটি তিনি অবশ্যই বুঝতেন । তিনি জনগণের ভালোবাসা বুঝতেন, জনগণকে মূল্য দিতেন। পৃথিবীতে এমন অনেক শাসক বা রাজা বাদশাহ আছেন যারা জনকল্যাণকর কাজ করেও সামান্য ভুলের কারণে জন নিন্দিত হয়েছেন,- যেখানে খালেদা জিয়া একমাত্র ব্যতিক্রম। ভুলের কারণে বহু ব্যক্তি, পরিবার ও ডাইনেষ্টি নষ্ট হয়ে গেছে। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব তার পরের উত্তোরাধিকার সঠিক ভাবে নির্বাচন করতে না পারায় মোঘল বংশ বা তাদের ডাইনেষ্টি শেষ হতে খুব সময় লাগেনি। সুলতান সুলেমান যোগ্য পুত্র শাহজাদা মোস্তাফাকে ভুল বুঝে মৃত্যু দন্ড দিয়ে চরম ভুল করেছিলেন, মুহাম্মদ বিন তুঘলক রাজধানী স্থানান্তর করে নিজের ক্ষতি ডেকে এনেছিলেন। হিটলার যদি তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ না করতেন তার করুন পরিনতি হতো না। দূর দর্শিতার অভাবে এমন আরোও বহুবিধ ভুল পৃথিবীতে অনেকেই করে নিজেদের ধ্বংস বয়ে আনেন। ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেলর কলোরিজের বিখ্যাত The Rime of The Ancient Mariner কাব্যে বলা হয়েছে, “Water, Water Evevy Where. Nor Any drops to drink. যার সাধারণ অর্থ- অনেক কিছু থাকার মাঝে ও কোন খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে যায়। বাংলার মহিয়সী নারী সদ্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শেষ করছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট